ইসলাম ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত কোরবানি। হাদিস শরিফে এ ইবাদতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত ফাতেমা (রা.)-কে তার কোরবানির নিকট উপস্থিত থাকতে বলেন এবং ইরশাদ করেন, এই কোরবানির প্রথম রক্তবিন্দু প্রবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ তাআলা তোমার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন।
তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসুল (সা.)! এটা কি শুধু আহলে বায়তের জন্য, নাকি সকল মুসলিমের জন্য? উত্তরে রাসুল (সা.) বললেন, এই ফজিলত সকল মুসলিমের জন্য।’ (মুসনাদে বাজযার-আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব: ২/১৫৪)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন,‘অতএব তুমি তোমার রবের উদ্দেশে নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো।’ (সুরা কাওসার: ২)
এদিকে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা কোরবানি দেয় না, তাদের ব্যাপারে হাদিস শরিফে কঠোর বার্তা এসেছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যার কোরবানির সামর্থ্য আছে তবুও সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (মুসনাদে আহমদ: ২/৩২১, মুস্তাদরাকে হাকেম: ৭৬৩৯, আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব: ২/১৫৫)।
কোরবানি কখন দিতে হয়?
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষ, যে ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।
হিসাবযোগ্য পণ্য
কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য পণ্য হলো: টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলংকার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না- এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি-গাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সব আসবাব।
কত টাকা থাকলে কোরবানি দিতে হয়?
কোরবানির নেসাবের পরিমাণ হলো: স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৮৭ দশমিক ৪৫ গ্রাম) ভরি, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে ৫২ (৬১২ দশমিক ১৫ গ্রাম) ভরি। টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হলো: এর মূল্য সাড়ে ৫২ ভরি রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হতে হবে।
সোনা বা রুপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনও একটি যদি আলাদাভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজনের অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে ৫২ তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাহলেও তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব।
কত টাকা থাকলে এ বছর কোরবানি ওয়াজিব হবে- তা জানতে হলে আগে রুপার মূল্য জেনে নিতে হবে।
শনিবার (২ মে) বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) দর অনুযায়ী, সাড়ে ৫২ তোলা ২২ ক্যারেট রুপার দাম হলো ২ লাখ ৮৭ হাজার ৮০৫ টাকা। সাড়ে ৫২ তোলা ২১ ক্যারেট রুপার দাম ২ লাখ ৭২ হাজার ৭৯০ টাকা। আর ১৮ ক্যারেট রুপা সাড়ে বায়ান্ন তোলার দাম পড়ে ২ লাখ ৩২ হাজার ৮৩৮ টাকা। সনাতন পদ্ধতির রুপা সাড়ে ৫২ ভরির দাম ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮৮ টাকা।
সুতরাং কোরবানির দিনগুলোতে কারো কাছে ন্যূনতম হিসেবে যদি ১ লাখ ৭৫ হাজার ৮৮ টাকা বা এর সমমূল্যের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকে, তাকে কোরবানি দিতে হবে। তবে কোরবানি যেহেতু ১০ জিলহজ থেকে ১২ জিলহজ সময়ের মধ্যে ওয়াজিব হয়, সে সময়ের দাম হিসাব করতে হবে। কারণ ততদিনে রুপার দাম কিছুটা পরিবর্তন হতে পারে। কোরবানি ওয়াজিব হয় ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সাড়ে ৫২ ভরি রুপার যে দাম থাকবে, তার ওপর ভিত্তি করে। (বাদায়েউস সানায়ে: ৪/১৯৬,আলমুহীতুল বুরহানি: ৮/৪৫৫)
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
কোরবানির দিনের আমলগুলোর মধ্য থেকে পশু কোরবানি করার চেয়ে অন্য কোনও আমল মহান আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয় নয়। কিয়ামতের দিন এই কোরবানিকে তার শিং, পশম ও ক্ষুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই মহান আল্লাহর কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো। (তিরমিজি: ১৪৯৩)