প্রচন্ড রোদের মধ্যে শহরের প্রধান সড়কগুলো ধরে চলা শোভাযাত্রায় খেলোয়াড়রা পানীয় হাতে উদযাপনে মেতে ওঠেন। লাল-হলুদ রঙে সজ্জিত সমর্থকদের ঢল বাসটির অপেক্ষায় ছিল। পরে পুরো দল সিবেলেস স্কয়ারে পৌঁছে মঞ্চে উঠে গভীর রাত পর্যন্ত উৎসবে অংশ নেয়।
ভিডিও বার্তায় পপ তারকা শাকিরা বলেন, “স্পেন বিশ্বকে দেখিয়েছে একসঙ্গে, এক মন ও এক হৃদয় নিযয়ে কাজ করার অর্থ কী।”
কোচ ডি লা ফুয়েন্তেও একই ধরনের বার্তা দিয়ে তার খেলোয়াড়দের “বিশ্বের সেরা” বলে আখ্যায়িত করেন এবং সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “একসঙ্গে থাকলে আমরা আরও শক্তিশালী হবো।”
এরপর খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ মিলে ট্রফি হাতে দলীয় ছবি তোলেন। অধিনায়ক রদ্রি আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন, যেমনটি তিনি রোববার নিউ জার্সিতে অতিরিক্ত সময়ে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জয়ের পর করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাদ্রিদে ফেরার পর সোমবার সকালে খেলোয়াড়দের প্রথমে রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ ও রাজপরিবার সংবর্ধনা জানান। এরপর তারা স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তারপরই বিজয় শোভাযাত্রা শুরু হয়।
শোভাযাত্রার সময় খেলোয়াড়রা ঝকঝকে বিশ্বকাপ ট্রফি একে অপরের হাতে তুলে দেন।
ফেরান তোরেসের অতিরিক্ত সময়ের একমাত্র গোলে স্পেন ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব অর্জন করে।
রাজা ফিলিপ স্পেনের খেলোয়াড়দের উদ্দেশে বলেন, “তোমরা নিজেদের দৃঢ়তা, লড়াকু মানসিকতা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছ। তোমরা হৃদয় ও মস্তিষ্ক- দুটিরই অসাধারণ সমন্বয় ঘটিয়েছ।”
রাজদরবারে খেলোয়াড়রা আনুষ্ঠানিক স্যুট পরেছিলেন। তবে গরমের দিনে শোভাযাত্রার জন্য পরে তারা আরামদায়ক পোশাক পরেন।
দলের বাসের সামনে লেখা ছিল “বিশ্বের রাজারা”। আর সমর্থকেরা তাদের নায়কদের উদ্দেশে বারবার “চ্যাম্পিয়ন, চ্যাম্পিয়ন” ধ্বনি তুলছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জযয়ের পর দলকে বহনকারী আইবেরিয়া বিমানের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় রদ্রি মাথার ওপর বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।
ম্যানচেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডার বলেন, এটি তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ অর্জন।
রদ্রি বলেন, “আমি সবসময়ই বলেছি, দেশের হয়ে জেতার চেয়ে সুন্দর কিছু নেই, আর তার ওপরে যদি সেটা বিশ্বকাপ হয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের প্রজন্ম বড় হয়েছে ইকার ক্যাসিয়াস ও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তাকে বিশ্বকাপ তুলতে দেখে। আজ আমরা নিজেরা সেটা করতে পেরেছি। ফুটবলে এর চেয়ে বড় অর্জন আর নেই।”
১৬ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ইনিয়েস্তার অতিরিক্ত সমযয়ের গোলে স্পেন প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল। বর্তমানের অনেক তররুণ সমর্থকের তখন জন্মই হয়নি।
১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী হেক্টর মোলার বলেন, “দ্বিতীয় তারকা পাওয়ায় আমি ভীষণ খুশি।” তিনি জানান, বাস শোভাযাত্রার সময় তিনি ফেরান তোরেস, টিনএজার তারকা লামিন ইয়ামাল এবং আর্সেনালের মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনোকে দেখতে পেরেছেন।
হেক্টর বলেন, “এমন একটি দিন নিজের চোখে দেখা আর অন্যের মুখে শোনা- দুই অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা।”
ফাইনালের জয়সূচক গোলদাতা ফেরান তোরেস মজা করে বলেন, “আমি তো সত্যিই উড়ছি!” যুক্তরাষ্ট্র থেকে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দেশে ফেরার পর নিজের অনুভূতি এভাবেই প্রকাশ করেন তিনি।
স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের বিজয় শোভাযাত্রা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন মোনক্লোয়া থেকে শুরু হয়ে সিবেলেস স্কয়ারে গিয়ে শেষ হয়। এটি স্পেন জাতীয় দলের ঐতিহ্যবাহী উদযাপনের স্থান। সেখানে সমর্থকেরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা আগে থেকেই জায়গা দখল করে অপেক্ষা করছিলেন।
আনন্দ-উল্লাসে ভরা রাতের শেষ দিকে খেলোয়াড়রা কোচ লুইস ডি লা ফুয়েন্তেকে কাঁধে তুলে নেন।
স্পেনের নারী দলও ২০২৩ সালে বিশ্বকাপ জিতেছিল। ফলে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একই সময়ে একটি দেশের পুরুষ ও নারী উভয় দলই বিশ্বকাপের শিরোপাধারী হলো।
২০৩০ সালে পর্তুগাল ও মরক্কোর সঙ্গে যৌথভাবে বিশ্বকাপের আয়োজক হবে স্পেন। সেবার নিজেদের মাটিতে পুরুষ দল শিরোপা রক্ষার মিশনে নামবে।
প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেন, “বিশ্বকাপের ফাইনালে আমাদের রেকর্ড এখন দুইয়ে দুই। তাহলে ২০৩০ সালে তৃতীয় শিরোপার স্বপ্নই বা দেখব না কেন, বিশেষ করে যখন স্পেনই আয়োজকদের একটি?”