গাজা যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো দুই দিনের সফরে ইসরায়েল গেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সফরকালে তিনি ইসরায়েলি পার্লামেন্টে ভাষণ দেবেন এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারযোগের সঙ্গে বৈঠক করবেন। সফরসূচিতে ফিলিস্তিনি নেতাদের সঙ্গে কোনো বৈঠক নেই।
দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও বাণিজ্য সহযোগিতা জোরদারের প্রেক্ষাপটে এ সফর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এক দশকের বেশি সময় আগে ক্ষমতায় আসার পর থেকে মোদির সময়ে ভারত-ইসরায়েল সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। ২০১৭ সালে তিনিই প্রথম ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইসরায়েল সফর করেন, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ সফর ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্যও একটি পরীক্ষা। একদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব বজায় রাখা, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা—এই দুই লক্ষ্য সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে এগিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে দিল্লির সামনে। ভারত সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়ে ইসরায়েলের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে, পাশাপাশি গাজায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু মোদির সফরকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লিখেছেন, ‘ইসরায়েল ও ভারতের বন্ধন দুই বৈশ্বিক নেতার শক্তিশালী জোট। আমরা উদ্ভাবন, নিরাপত্তা ও অভিন্ন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির অংশীদার।’ জবাবে মোদি বলেন, ‘বিশ্বাস, উদ্ভাবন ও শান্তি-অগ্রগতির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বকে ভারত গভীরভাবে মূল্যায়ন করে।’
পররাষ্ট্রবিশেষজ্ঞ হর্ষ ভি. পন্ত বলেন, ‘ভারত ইসরায়েলের সঙ্গে তার অংশীদারত্বে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—এ বার্তাই দিতে চায়, তবে একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের অগ্রাধিকারগুলোর ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টাও করছে।’
সফরটি এমন সময়ে হচ্ছে, যখন আঞ্চলিক উত্তেজনা তীব্র। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ঠেকাতে অঞ্চলটিতে সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, তবে মোদির সফরের মূল ফোকাস থাকবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক; আঞ্চলিক উত্তেজনা নিয়ে আলোচনা হলে তা সম্ভবত পর্দার আড়ালেই সীমিত থাকবে।
ভারত ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মধ্যপ্রাচ্য দপ্তরের নির্বাহী পরিচালক কবির তানেজা বলেন, ‘ভারতের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, আঞ্চলিক সংঘাত ওই অঞ্চলকেই সমাধান করতে হবে। ভারত যেমন নিজের বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করে না, তেমনি একই নীতি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।’
তেল আবিবে পৌঁছে মোদি নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং পরে জেরুজালেমে যাবেন। সফর শুরুর আগে কনেসেট ভবন ভারতীয় পতাকার রঙে আলোকিত করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবি শেয়ার করে মোদি আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
তবে কনেসেটে তার ভাষণ ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রেসিডেন্ট আইজাক আমিতকে আমন্ত্রণ না জানালে বিরোধীরা ভাষণ বয়কটের হুমকি দিয়েছে। এদিকে ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়ারাম রমেশ সফরটির সমালোচনা করে ফিলিস্তিনি ইস্যুতে সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সমালোচনা সত্ত্বেও বিশ্লেষকদের মতে, সফরটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের প্রতিফলন। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতায় এখনও পিছিয়ে থাকা ভারত, বিশেষ করে পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে, উন্নত প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে ইসরায়েলকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা ও সংযোগ প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, মোদি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশংসা করলেও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের ভারসাম্য নষ্ট না করার দিকেও সতর্ক থাকবেন।সূত্র- বিবিসি