জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে জাতীয় সংসদে চলমান বিতর্ক দ্রুত অবসানের আহ্বান জানিয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কোনো পদ্ধতির প্রয়োজন নেই; বরং সনদের মধ্যেই এর সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
আজ রোববার ( ৫ এপ্রিল) সংসদে সরকারি দলের সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক (নোয়াখালী-২) কর্তৃক আনীত জন-গুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব (বিধি-৬২) -এর ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন।
‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ ‘ভবিষ্যতের পথ রেখা’-একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যা সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন আইন-কানুন প্রণয়ন, সংশোধন, সংযোজন পরিমার্জন’র বিষয়ে তিনি প্রস্তাবটি আনেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ দলিল, যেখানে বাস্তবায়নের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে নির্ধারিত আছে। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদই তার বাস্তবায়নের পথ নির্দেশ করে, অতিরিক্ত কোনো কাঠামো বা পদ্ধতি এখানে প্রয়োজন নেই।’
তিনি বলেন, গণভোট অধ্যাদেশে যে ৩০টি বিষয়ের তফসিল নির্ধারণ করা হয়েছে, তার মধ্যে জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ অন্তর্ভুক্ত নয়। অথচ এই অনুচ্ছেদে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন এবং প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে উচ্চকক্ষের সদস্য নির্বাচন করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। এটি বাদ দেওয়া হলে তা সংবিধানের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ হবে এবং জনগণের মতামতের সঠিক প্রতিফলন ঘটবে না, বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইনমন্ত্রী সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রসঙ্গে ‘কালারেবল লেজিসলেশন’-এর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, এমন আইন প্রণয়ন করা ঠিক নয়, যেখানে বাহ্যিকভাবে বৈধতা দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে তা সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে। এ ধরনের উদ্যোগ সংবিধানবিরোধী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
জুলাই সনদের প্রতিটি অনুচ্ছেদের পেছনে মানুষের রক্ত, কষ্ট ও সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে- উল্লেখ করে মো. আসাদুজ্জামান তার বক্তব্যে জুলাই সনদের পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়; বরং বহু বছরের আন্দোলন, ত্যাগ, নির্যাতন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের ফল।
তিনি আরও বলেন, ৩৩টি রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে এই সনদ প্রণীত হয়েছে, যা জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। তাই এর বাস্তবায়নে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সংবিধান সংশোধনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জুলাই সনদের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়নের জন্য সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুসরণ করেই সংশোধনী আনতে হবে। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি সংশোধনই একেকটি সংস্কার, কিন্তু প্রতিটি সংস্কার সংবিধান সংশোধন নয়—এই পার্থক্য বুঝতে হবে।’
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে সংস্কারের ধারণা আসে, তা চূড়ান্তভাবে সংসদে আইন আকারে রূপ নিতে হলে সংবিধান সংশোধনের পথেই যেতে হবে। সংসদই সেই স্থান, যেখানে জনগণের ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে এসব সংস্কারকে আইনি রূপ দেওয়া হয়।
এ সময় আইনমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, জুলাই সনদের বিভিন্ন অনুচ্ছেদেই সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি বারবার উল্লেখ করা হয়েছে, যা এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা রাখে না।
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক নয়, বরং এর আলোকে এগিয়ে গিয়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।’