বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিশ্বের ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী (ইমিগ্র্যান্ট) ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। তবে এই নিষেধাজ্ঞা পর্যটক, ব্যবসা বা অন্যান্য অস্থায়ী (নন-ইমিগ্র্যান্ট) ভিসার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি নথিতে এমনটি উল্লেখ করা হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানিয়েছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তা নিতে পারেন, এমন ব্যক্তিদের যাওয়া ঠেকাতে আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন করতে যাচ্ছে পররাষ্ট্র দপ্তর। এটি না হওয়া পর্যন্ত অভিবাসী ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ৭৫টি দেশের অভিবাসী ভিসা আবেদনপ্রক্রিয়া স্থগিত করতে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি পরিকল্পনার বিস্তারিত জানাননি।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, যেসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে সরকারি সহায়তা বা কল্যাণ সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার আশঙ্কা বেশি, সেসব দেশের ক্ষেত্রেই অভিবাসী ভিসা-প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানসহ বেশির ভাগ দেশই আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকার।
পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমেরিকার অভিবাসন ব্যবস্থার অপব্যবহার বন্ধ করাই এই পদক্ষেপের লক্ষ্য। আমরা এমন বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ ঠেকাতে চাই, যারা ভবিষ্যতে মার্কিন করদাতাদের অর্থে পরিচালিত কল্যাণ কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তের ভিত্তি তৈরি হয়েছে গত নভেম্বরে জারি করা একটি নির্দেশনার ওপর, যেখানে মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেট কর্মকর্তাদের বলা হয়েছিল-ভিসা আবেদনকারীদের আর্থিক সক্ষমতা, স্বাস্থ্য, বয়স, পারিবারিক অবস্থা, শিক্ষা, দক্ষতা এবং অতীতে সরকারি সহায়তা নেওয়ার ইতিহাস অত্যন্ত কঠোরভাবে যাচাই করতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের হাজারো পরিবারকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে, যাদের অনেকেই পরিবারভিত্তিক অভিবাসন, স্থায়ী বসবাস কিংবা গ্রিন কার্ডের জন্য আবেদন করে থাকেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আবেদনকারীদের ইংরেজি দক্ষতাও যাচাই করা হতে পারে, এমনকি ইংরেজিতে সাক্ষাৎকার নেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
যদিও যুক্তরাষ্ট্রের আইনে আগেও ‘পাবলিক চার্জ’ হওয়ার ঝুঁকি যাচাইয়ের বিধান ছিল, তবে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে এই সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করেন। বর্তমান নির্দেশনা সেই কঠোরতাকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে বলে মনে করছেন অভিবাসন বিশ্লেষকরা।
তবে আশার কথা হলো, ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ ও ২০২৮ অলিম্পিক গেমস সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রে পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভিসার চাহিদা বাড়বে, এবং সেসব ভিসা এই স্থগিতাদেশের বাইরে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা হলেও, যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, এই স্থগিতাদেশ স্থায়ী নয়; বরং ভিসা-প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের অংশ।
স্থগিতাদেশের আওতায় থাকছে যেসব দেশ
আফগানিস্তান, আলবেনিয়া, আলজেরিয়া, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহামা, বাংলাদেশ, বার্বাডোজ, বেলারুশ, বেলিজ, ভুটান, বসনিয়া, ব্রাজিল, বার্মা, কম্বোডিয়া, ক্যামেরুন, কেপ ভার্দে, কলম্বিয়া, কঙ্গো, কিউবা, ডোমিনিকা, মিসর, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া, ফিজি, গাম্বিয়া, জর্জিয়া, ঘানা, গ্রানাডা, গুয়াতেমালা, গিনি, হাইতি, ইরান, ইরাক, আইভরি কোস্ট, জ্যামাইকা, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, কিরগিজস্তান, লাওস, লেবানন, লাইবেরিয়া, লিবিয়া, ম্যাসিডোনিয়া, মলদোভা, মঙ্গোলিয়া, মন্টিনিগ্রো, মরক্কো।
এ ছাড়া নেপাল, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, রাশিয়া, রুয়ান্ডা, সেন্ট কিটস ও নেভিস, সেন্ট লুসিয়া, সেন্ট ভিনসেন্ট ও গ্রেনাডাইনস, সেনেগাল, সিয়েরা লিওন, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান, সিরিয়া, তানজানিয়া, থাইল্যান্ড, টোগো, তিউনিসিয়া, উগান্ডা, উরুগুয়ে, উজবেকিস্তান ও ইয়েমেন।