আজ শুক্রবার (১৬ মে) দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে হাজারো কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, প্রাপ্তবয়স্ক, প্রবীণের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিলো নারীর ডাকে মৈত্রী যাত্রা কর্মসূচী।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, চব্বিশের অভূতপূর্ব জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে আজ আমরা এক গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি মুহূর্তে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। আমাদের দাবি একটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ। যেখানে সব মানুষের মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে বৈষম্যবিরোধিতা ও সাম্যের যৌথ মূল্যবোধের ওপর। সমতা ও ন্যায্যতার পথে এ মৈত্রীযাত্রায় আমরা সবাইকে স্বাগত জানাই।
“সমতার দাবিতে আমরা”—এই মূল স্লোগানকে ঘিরে গড়ে ওঠা এ আয়োজনে অংশ নেন জুলাই অভ্যুত্থানে আহত ও নিহতদের স্বজন, নারী, শ্রমিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক, লেখক, ছাত্র, সাংবাদিকসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। নারীর অধিকারের প্রশ্নে এক স্বতঃস্ফূর্ত মিলন-মেলা।
বিকেল ২টা ৪৫ থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৩০ পর্যন্ত চলে এই ব্যতিক্রমী কর্মসূচি চলে। গানের ভাষায়, নাটকের ছলে, দলীয় সঙ্গীতে—প্রতিবাদ, প্রত্যয় আর সম্ভাবনার সুর বাজে। তবে ছিল না কোনো একক বক্তা, ছিল না কোনো নেতা—ছিল কেবল মানুষের ঢল এবং সমতার আহ্বান।
কর্মসূচির সূচনা হয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে। এরপর লাল রঙের অস্থায়ী মঞ্চ থেকে টানা পরিবেশিত হয় প্রতিবাদী গান, নাটিকা, অভিনয় আর নৃত্যগীত। গাওয়া হয় চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো সঙ্গীত। “তীর হারা ওই ঢেউয়ের সাগর” আর “কারার ঐ লৌহকপাট” থেকে শুরু করে নানা জাগরণী সুরে মুখর হয় সমগ্র সড়কজুড়ে জনসমুদ্র।
এই কর্মসূচি ছিল যেন একটি ক্ষণস্থায়ী বিকল্প সমাজ। একদিনের জন্য হলেও সেই সমাজে ছিল না কোনো ক্ষমতা-কাঠামো, ছিল না দল-মতের বিভাজন।
৩১টি স্পষ্ট স্লোগানে ফুটে ওঠে নারীর অধিকার, মর্যাদা, শ্রমিকের ন্যায্যতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার আহ্বান। এমনকি ছিল ফিলিস্তিনিদের পক্ষে সংহতির বার্তাও।
তিন ভাগে বিভক্ত ঘোষণাপত্রে বলা হয়, নারীর অধিকার শুধু নারীর নয়—তা একটি ন্যায়-ভিত্তিক সমাজের নির্ণায়ক। যারা ক্ষমতায় আছেন, বা আসবেন, তাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি—নারী, শ্রমিক, হিজড়া, ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার কোনো শর্তাধীন নয়। আরও বলা হয়, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের বিলুপ্তি চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রবল উদ্বেগ রয়েছে। সরকারের নীরবতা আসলে একটি বার্তা—এই দাবি-আন্দোলনকে ভয় দেখিয়ে থামিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে।
বক্তব্যে উঠে আসে ঘৃণা-বিদ্বেষের রাজনীতির প্রতি উদ্বেগ। তারা বলেন, সংস্কৃতি, ধর্ম ও নারীকে দমনমূলক অস্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা করা হলে আমরা তা প্রতিরোধ করব।
সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি ছিল একটি কড়া বার্তা দিয়ে তারা বলেন, আপনাদের উপর আমরা নজর রাখছি। তারা আরও বলেন, সংখ্যালঘু নারীদের বাদ দিয়ে কোনো সংস্কার নয়, কোনো গণতন্ত্র নয়।
বিকেল ৫টায় মঞ্চ থেকে পাঠ করা হয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্র। পাঠ করেন শহিদ মামুন মিয়ার স্ত্রী শারমীন আক্তার, জয়ন্তী চাকমা এবং সামসীয়ারা জামান।
ঘোষণাপত্রে বেশ কয়েকটি দাবি উপস্থাপন করা হয়ঃ
সেগুলো হলো- অন্তর্বর্তী সরকারকে তার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে, বিশেষত নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি, নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ঘিরে গুজব ও অপপ্রচার, এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আতঙ্ক সৃষ্টির বিরুদ্ধে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।
>> যারা আমাদের সমর্থন চায় নির্বাচনী অঙ্গীকারের মাধ্যমে হোক বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোক। তাদের স্পষ্ট করতে হবে নারী, শ্রমিক, জাতি, ধর্ম, ভাষা ও লিঙ্গীয় সংখ্যালঘুদের অধিকার এবং এসব জনগোষ্ঠীর পূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত মুক্তির বিষয়ে তাদের অবস্থান কী। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন থেকে তাদের প্রার্থীদের অন্তত শতকরা ৩৩ ভাগ (ক্রমান্বয়ে জনসংখ্যার অনুপাতে) নারী হতে হবে।
>> নারী ও প্রান্তিক জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অন্তর্বর্তী সরকারকে আশু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়, আমাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য চালিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা আমরা মেনে নেবো না। আমাদের মৌলিক অধিকারগুলোকে অস্বীকার করার ষড়যন্ত্র আমরা প্রতিরোধ করবো। বিশৃঙ্খলা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা, সংস্কৃতি ও ধর্মকে দমনমূলক অস্ত্রে পরিণত করার চেষ্টা আমরা প্রতিরোধ করব। ইতিহাস বিচ্ছিন্ন কূপমণ্ডুকতার মাধ্যমে সহিংসতা ও বৈষম্য চালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাকে আমরা কিছুতেই সফল হতে দেবো না। আমাদের সংস্কৃতি, ধর্ম ও ইতিহাস দারুণ বৈচিত্র্যময় এবং সংবেদনশীল। সেই বিশালতাকে উপেক্ষা করে আমরা গুটি কয়েক মানুষের সংকীর্ণ ব্যাখ্যাকে সার্বজনীন হতে দেবো না। আমরা অধিকার ও ধর্মের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করতে দেবো না, মর্যাদা নিয়ে কোনো ধরনের দ্ব্যর্থকতা মেনে নেবো না। আমরা সরকার ও প্রতিটি রাজনৈতিক দলের নারী বিষয়ক অবস্থান নজরদারিতে রাখবো। যে ক্ষমতা কাঠামো এসব জুলুমবাজি জিইয়ে রাখে, আমরা সেই কাঠামোকে ভাঙবো।
আরো বলা হয়, আমরা চুপ করবো না, হুমকির মুখে নত হবো না। আমরা আমাদের অধিকার আদায়ের দাবিতে অটল থাকবো। ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন ও তা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আমরা হাল ছাড়বো না। আজ যারা আমাদের সঙ্গে রয়েছেন তাদের ধন্যবাদ। আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।
কর্মসূচি শেষে বিকাল ৫টার কিছু পরে একটি র্যালি বের হয় । ফার্মগেট ঘুরে তা সন্ধ্যা ৬টা ৩৭ মিনিটে মানিক মিয়ায় ফিরে শেষ হয়।