শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০৯:৩৮ অপরাহ্ন

২০২৫ সালে ৯১৪ রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত ১৩৩,মব-গণপিটুনিতে নিহত ১৬৮ : এইচআরএসএস

নিউজ ডেস্ক | মেট্রোটাইমসটোয়েন্টিফোর.কম
আপডেট : বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৬, ৭:১০ অপরাহ্ন

বিদায়ী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে দেশে নানাবিধ সহিংসতার দিক বিবেচনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষত রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, সীমান্তে হত্যা ও নির্যাতন এবং শিশু ও নারীর প্রতি সহিংসতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। 

আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি)  মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সংবাদপত্রের প্রতিবেদন এবং নিজেদের তথ্যানুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারাদেশে রাজনৈতিক ও দলীয় আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ পরায়ণতা, সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, কমিটি গঠন নিয়ে বিরোধ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থাপনা দখল কেন্দ্রিক ৯১৪টি সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত হয়েছেন।

এদের মধ্যে বিএনপির ৯৩ জন, আওয়ামী লীগের ২৩ জন, জামায়াতের ৩ জন, ইনকিলাব মঞ্চের একজন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের একজন, ইউপিডিএফের ৬ জন এবং চরমপন্থী দলের একজন রয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন ৭ হাজার ৫১১ জন।আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী সহিংসতার ৫৪টি ঘটনায় তিনজন নিহত এবং ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন।

বিদায়ী বছরে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীদের নামে কমপক্ষে ২৪৪টি মামলা হয়েছে।

এসব মামলায় ১১ হাজার ৯৩৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৪২ হাজার ৫২৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মামলায় ও যৌথ বাহিনীর অভিযানে ৫০ হাজারের অধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের অধিকাংশই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মী । পুলিশ গত এক বছরে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন হিযবুত তাহ্‌রীরের অন্তত ৪৭ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে।মব-গণপিটুনিতে নিহত ১৬৮
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৯২টি ঘটনায় মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে ১৬৮ জন নিহত ও ২৪৮ জন আহত হয়েছেন।

খুন তিন সাংবাদিক
বিদায়ী বছরে ৩১৮টি হামলার ঘটনায় কমপক্ষে ৫৩৯ জন সাংবাদিক হত্যা, নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে তিনজনকে হত্যা, ২৭৩ জনকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন ও আহত, ৫৭ জনকে লাঞ্ছিত, ৮৩ জনকে হুমকি এবং ১৭ জন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৩৪টি মামলায় ১০৭ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ ও সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর অধীনে ২৭টি মামলায় ২৪ জনকে গ্রেপ্তার এবং ৫৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সারাদেশে ৪৭টি সভা-সমাবেশ আয়োজনে বাধা প্রদান, ১৪৪ ধারা জারি, সংঘর্ষ, সভাসমাবেশ থেকে আটকসহ বিভিন্ন ঘটনা ঘটেছে।

এতে ৫১২ জন আহত এবং ৩৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।বিচারবহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশি হেফাজত, নির্যাতন, গুলি, বন্দুকযুদ্ধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংষর্ষ ইত্যাদি ঘটনায় ৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ছয়জন সংঘর্ষে বা কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে, ১২ জন নির্যাতনে, ১২ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে এবং ১০ জন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। এছাড়া পুলিশের ভয়ে পালাতে গিয়ে ও অসুস্থ হয়ে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। কারাগারে বা কারা হেফাজতে অসুস্থ, আত্মহত্যা ও নির্যাতনে ৯২ জন আসামি (৩০ জন কয়েদী ও ৬২ জন হাজতি) মারা গিয়েছেন।

ধর্ষণের শিকার ৮২৮, ধর্ষণের পর খুন ২৮ জন
২০২৫ সালে কমপক্ষে ২ হাজার ৪৭ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮২৮ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, এর মধ্যে ৪৭৪ জন ১৮ বছরের কম বয়সী/শিশু। এছাড়া ১৭৯ জন নারী ও কন্যা শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৮ জনকে। এসব ঘটনায় আত্মহত্যা করেছেন ১০ জন নারী।

৪১৪ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তন্মধ্যে শিশু ২৩৬ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩৫ জন (আত্মহত্যা-৪) ও আহত ৩২ জন। তাছাড়া পারিবারিক সহিংসতায় ৩৮৩ জন (আত্মহত্যা ১৯৪ জন) নিহত ও আহত ১৩৩ জন। অ্যাসিড সহিংসতায় শিকার হয়ে নিহত দুজন এবং আহত দুজন।

বিএসএফের গুলিতে নিহত ৩০, দুজনকে পিটিয়ে খুন
সীমান্তে হতাহত, আটক ও অবৈধভাবে পুশইন এর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনা বলা হয়, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে অন্তত ৩০ জন নিহত এবং দুজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ৬৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাছাড়া সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় নাগরিকদের গুলিতে ও হামলায় অন্তত সাতজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে কমপক্ষে ৩৪৯৩ জনকে বাংলাদেশে পুশইন ও ভারতীয় জলসীমার কাছে বঙ্গোপসাগর থেকে ১৪৩ জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে ভারতীয় কোস্টগার্ড।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে আরাকান আর্মির গুলিতে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুজন আহত হয়েছেন। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক আনসার সদস্যসহ ১২ জন বাংলাদেশি আহত হয়েছেন এবং একজন নিহত হয়েছেন। সীমান্তের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের জলসীমা থেকে ২১টি ট্রলারসহ কমপক্ষে ১৭৬ জন জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।

ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর কমপক্ষে ২৮টি হামলার ঘটনায় একজন নিহত, ১৬ জন আহত, ছয়টি মন্দির, ৩৭টি প্রতিমা ও ৩৮টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং পাঁচটি জমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সারাদেশে ৫৬টিরও বেশি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এতে মাজারে ও বাউল অনুসারীদের মধ্যে একজন নিহতসহ অর্ধ-শতাধিক আহত হয়েছেন।

শ্রমিক নির্যাতনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ৩৫৯টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় শ্রমিক অসন্তোষ, শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, হামলাসহ নানা কারণে ৯৬ জন নিহত ও এক হাজার ২১ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ১৬৮ জন শ্রমিক তাদের কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছেন। চারজন গৃহকর্মী মালিকের নির্যাতনে নিহত এবং আটজন গুরুতর আহত হয়েছেন।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মব সহিংসতা, হেফাজতে মৃত্যু, রাজনৈতিক উত্তেজনা, নির্বাচনী সহিংসতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের বিষয় সমাধান না করা হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।

এসময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।


এই ক্যাটাগরির আরও সংবাদ
এক ক্লিকে বিভাগের খবর